গল্প : রকস্টার।

আরেকটি সপ্তাহান্ত অতিবাহিত হইল।
অন্তরের মণিকোঠায় সঞ্চিত রাখিবার মতন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে নাই।অতএব চর্বিত চর্বণ করিবার মতনই একটি অতি পুরাতন ঘটনার বর্ণন করিতেছি।

* কারিগরীবিদ্যা পঠনের সুবাদে বিদ্যার্জন কিরূপ হইয়াছিল,তাহার বিবরণ অনর্থক।সপ্তবর্ষ পূর্বে পঠিত চতুর্বষের পাঠক্রমের অধিকাংশই অব্যবহৃত হইয়া মনুষ্যের পুচ্ছের ন্যায় লুপ্ত হইয়াছে।
বরঞ্চ পঠনকালে অধিকাংশ ছাত্রের একটি পুচ্ছের আবির্ভাব হইয়া থাকে যেটি চাকুরীজীবনের সূচনায় বস/মালিকের তিরষ্কারে অর্ধেক ঝড়িয়া যায়,আর বিবাহের পরবর্তীকালে বাকি অর্ধেক।

এইরূপ পুচ্ছ বাহির হইয়াছিল আমার এক পরিচিতের।কাহিনীকে অগ্রসর করিবার হেতু তাঁহার কল্পিত নাম ধরা হউক নিউটন।নিউটন বঙ্গদেশের একটি প্রাইভেট কলেজে পঠনরত ছিল।গৌড়বর্ণ,নধরকান্তি নিউটন গ্রাম হইতে শহরে আসিয়া অভিযোজিত হইয়া কার্বণ ফ্রেমের চশমা ত্যাগ করিয়া রিমলেস্ চশমার পাণিগ্রহণ করিল।তদুপরি এক শহুরে বন্ধুর সুবাদে তাঁহার পরিচয় ঘটিল এক অতি প্রচলিত সঙ্গীত ঘরাণার সহিত যাহার নাম Rock Music।সে ঘরাণা প্রতিবাদী সঙ্গীতের।যে অঞ্চলে উহার সাধনা হয় তাহার আশে পাশে অন্ততঃ এক বর্গকিমির পরিসরে শিশু বধির হইয়া যায়,সত্তোরর্ধ বুড়াবুড়ি গোলকধামে পারি দেয়।জয়ঢাক,কাঁসর,কামান,শঙ্খ সব একত্রে গর্জে উঠিলেও ইহার সিঁকিভাগের সমতূল্য নয়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশ করিবার উপায় থাকিলে ইহা তাঁহার অনুরূপ।সাধারণ বেশভূষায় এই সঙ্গীত সাধন সম্ভবপর নহে।তন্ত্রসাধনায় যেরূপ রুদ্রাক্ষ,লাল তিলক ও লাল বসন অপরিহার্য্য সেই রূপ রক সাধকরাও এক বিশেষ পরিধানরীতি মানিয়া চলেন।ইহারা হীরু ডাকাত ও ঠ্যাঙারেদের ন্যায় ঝাঁকড়া চুল রাখিয়া থাকেন,পরণে কঙ্কাল ছাপ কালো উত্তরীয় ও ইহাদের গ্রীবায় বিচিত্র ধরণের চিহ্ন বিশিষ্ঠ লকেট শোভা পাইয়া থাকে।দেহের চামড়ার বিভিন্ন স্থানে উল্কি ও হস্তে পেঁচাইয়া থাকে কালোপুঁতির মালা অথবা কন্টকময়/কঙ্কালছাপ চর্মবেষ্টণী।এইরূপ করাল রুপ দেখিয়া পাছে কেউ ইহাদের অঘোরী ভাবিয়া সমাজচ্যূত না করে তাই ইহারা বাদ্যযন্ত্র সঙ্গে লইয়া চলে।ছেলেবেলা হইতে একাকী নিউটন নিজ নিঃসঙ্গতা তাড়াইতে গিয়া ইহাদের মাঝে গিয়া ইহাদের একজন হইয়া উঠিল।

ইস্কুলের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে এক কীর্তনরূপ অশ্লীল জীবনমুখী সঙ্গীত গাহিবার কারণে চপেটাঘাত,বেত্রাঘাত সহ হেডমাষ্টার যে নিউটনকে বাহির করিবার উপক্রম করিয়াছিলেন,সেই নিউটন কলেজে আসিয়া রকসাধক হইয়া উঠিল।ছুটিতে বাড়িতে না গিয়া রকসাধনায় মজিল।প্রাশ্চাত্যের গান শুনিয়া অনুপ্রাণিত হইয়া সঙ্গীত লিখিতে লাগিল।সাথে সুর করিতে লাগিল।রেওয়াজ শুনিয়া বাড়ির মালিক আসিয়া প্রবল খেউর করা সত্ত্বেও নিউটনের সাধনার অন্ত রহিল না।ইহার সাথে জুড়িল এক নূতন স্বভাব – গঞ্জিকা সেবন।উহা বিনা রক সাধনা মণিহারা ফণী।নাদুসনুদুস ছেলে শুকাইয়া চিন্ময় হইয়া যাইতে লাগিল।
ছেলের এহেন দশা দেখিয়া নিউটনের জননী বড়ই বিচলিত বোধ করিতে লাগিলেন।তবে নিউটনের মেসে আসিয়া পর্যবেক্ষণ করিয়াও নিউটন জননী বুঝিতে পারিতেন না,নিউটন কেমনে শুকাইয়া যাইতেছে।কারণ নিউটন অপকর্মটি সারিত মেসের ছাতে অবস্হিত ঘনকাকার জলাধার এর পেছনে লুকাইয়া।তাঁহার সকাল ও বিকেলের গঞ্জিকার ছিলিম (নাম লালকমল, নীলকমল) ও মশলা সে দুটি ছোট্ট শোনপাপড়ির প্লাসটিক পিটারায় (অশ্বিনীকুমারদ্বয়) ভরিয়া সে জলাধারের পাশেই একটি গর্তে লুকাইয়া রাখিত।

সপ্তাহান্তে বাড়ি যাইলেও নিউটন তাঁহার গুড়োমশলা বা তামাক লইয়া যাইত।
এরূপ একদিন সপ্তাহান্তে ছুটিতে দেশের বাড়ি ফিরিল নিউটন।চেহারা দেখিয়া চিনিবার উপায় নাই।অথচ মায়ের মমতা বাঁধিবার নহে।অতএব গ্রীষ্মের দ্বিপ্রহরে গরম ভাত,গন্ধরাজ লেবু,আমডাল,আলুভাজা,পটলপোস্ত,কাতলার কালিয়া ও কচি পাঁঠার ঝোল সহযোগে আহার সারিয়া নিউটন খাতা পেন লইয়া রক সঙ্গীত লিখিবার উপক্রম করিতেছে।এমতাবস্হায় এক বাউল ভিখারি আসিয়া বাসার উঠানে গান জুড়িল।এরুপ ন্যাকা সুর সমৃদ্ধ সঙ্গীতে রক বিশারদদের ইজ্জত বিপর্যস্ত হয়।চিৎকার করিয়া উঠিল নিউটন – “মা,শিগ্গির খুচরো দিয়ে এটাকে বিদায় কর”।নিউটনের পিতৃদেব ব্যবসাসূত্রে এক হপ্তার জন্য বাইরে গিয়াছিলেন।জননী কহিলেন – “খুচরো তো নেই রে”
নিউটন টেবিল হইতে মুখ না তুলিয়াই কহিল – “আমার মানি ব্যাগ থেকে নিয়ে দিয়ে দাও”।

খানিকক্ষণ সাড়া শব্দ নাই।বাউল চলিয়া গেছে।হঠাৎ একটি শাখাপলা সমৃদ্ধ গোল হাত পেছন দিক থেকে আসিয়া নিউটনের কর্ণপটহ আকর্ষণ করিল।পরক্ষণেই অপর হস্ত নিউটনের ঝুলপি আকর্ষণ করিল।উহার ঠিক এক পলকের মধ্যে নিউটনের দুইটি গালে বর্ষিত হইতে লাগিল বিরাশি সিক্কার চড়।থতমত খাইয়াও পরক্ষণেই ব্যাপারটা জলবৎ তরলং হইয়া গেল। নিউটন ভ্যাঁ করিয়া কাঁদিয়া উঠিয়া রণংদেহীমূর্তির মাতৃদেবীর পদযুগলে গড়াগড়ি খাইতে লাগিল।চেচাঁইতে লাগিল – “ছেড়ে দাও,আর জীবনে খাব না,এই পা ধরে দিব্যি খাচ্চি,আর খাব না,বাবাকে বলবে না”।দশ মিনিট তীব্র প্রহারের পর মাতা শান্ত হইলেন।নিজমস্তক ও মন্দিরের শিবকে স্পর্শ করাইয়া নিউটনকে প্রতিজ্ঞা করাইলেন – “আমি আর জীবনে গাঁজা খাব না”।গাঁজার কান্ডারী শিব হয়ত হাসিল।কিন্তু নিউটনের রকসাধনে আড়াআড়ি লাল দাগ পড়িয়া গেল।

বাউলের জন্য খুচড়া বাহির করিতে গিয়া নিউটনের চর্মবটুয়া হইতে নিউটন জননী নিউটনের গাঁজার প্যাকেটটি আবিষ্কার করেন ও কাজের মেয়ে মামণির (গাঁজাখোর নিতাই এর বৌ) সাহায্যে কনফার্ম হইয়া যান্।

“এটা কি রে মামণি?”
– “ও বৌদি, এত গাঁজা,তুমি কোথায় পেলে,শিবমন্দিরের বুঝি?”

নিউটন আজও গাঁজা স্পর্শ করে না,বন্ধুদের মাঝে তামাকের আসর জমিলে, মনকষ্টে বসিয়া বাউলটিকে গালিগালাজ করে।